চর্মরোগ সোরিয়াসিসঃ সংজ্ঞা লক্ষণ কারণ চিকিৎসা ও প্রতিকারের ঘরোয়া উপায়

চর্মরোগ সোরিয়াসিসঃ সংজ্ঞা লক্ষণ কারণ চিকিৎসা ও প্রতিকারের ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে আজকের আর্টিকেলটি লেখা। সোরিয়াসিস ত্বকের সাধারণ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ জনিত একটি জটিল রোগ। যেকোনো বয়সের নারী-পুরুষরাই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এ রোগটি সংক্রমণ ব্যাধি না বা ছোঁয়াচে রোগ নয়, কাজেই একজনে সংস্পর্শে অন্য জনের এ রোগ ছড়ায় না। দিন দিন বাংলাদেশে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে।
চর্মরোগ সোরিয়াসিসঃ সংজ্ঞা লক্ষণ কারণ চিকিৎসা ও প্রতিকারের ঘরোয়া উপায়

মানব শরীরে ত্বকের কোষস্তর গুলো প্রতিনিয়তই মারা যায় ও নতুন করে তৈরি হয়। এ রোগে কোষ তৈরি হওয়ার হার কয়েক গুণ বেশি বা অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ত্বকের সবচেয়ে গভীর স্তর থেকে নতুন কোষ তৈরি হয়ে উপরের স্তরে আসতে সময় লাগে সাধারণত ২৮ দিন। কিন্তু এ রোগের ক্ষেত্রে এই সময় লাগে মাত্র ৫ থেকে ৭ দিন। বিশ্বজুড়ে এ রোগে আক্রান্ত মানুষের হার মাত্র এক থেকে দুই শতাংশ।
পেজ সূচীপত্র

চর্মরোগ সোরিয়াসিস কাকে বলে 

চর্মরোগ সোরিয়াসিসঃ সংজ্ঞা লক্ষণ কারণ চিকিৎসা ও প্রতিকারের ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে জানার আগে একটু জেনে নেওয়া যাক এ রোগের সংগা বা এ রোগ কাকে বলে সে সম্পর্কে।

সোরিয়াসিস (Psoriasis) একটি দীর্ঘস্থায়ী পুনরাবৃত্তি মূলক ত্বকের জটিল ব্যাধি। ত্বকের উপরে সামান্য উঁচু ললচে বা রূপালি আঁশযুক্ত ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। চামড়াগুলো উঠে গেলে অনেক সময় লালচে রং ধারণ করে বা অল্প রক্তক্ষরণ হতে পারে।

এই রোগটি সাধারণত কনুই, হাঁটু, মাথার ত্বক, বুক বা নিতম্বের হয়ে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে সারা শরীরেও হতে পারে।

কোন বয়সে এই রোগ বেশি হয়?

চর্মরোগ সোরিয়াসিসঃ সংজ্ঞা লক্ষণ কারণ চিকিৎসা ও প্রতিকারের ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা জেনে নিব কোন বয়সে এ রোগ বেশি হয় সে সম্পর্কে। এ রোগের নির্দিষ্ট কোন বয়স সীমা নেই।

আরও পড়ুন ঃ যে ১৭ টি খাবার খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে ও শরীর সুস্থ থাকে।

ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকলেরই এ রোগ হতে পারে। তবে বিভিন্ন গবেষণালব্ধ ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের নারী-পুরুষ উভয়ের এ রোগ বেশি হয়। 

চর্মরোগ সোরিয়াসিসের লক্ষণ 

চর্মরোগ সোরিয়াসিসঃ সংজ্ঞা লক্ষণ কারণ চিকিৎসা ও প্রতিকারের ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা জেনে নিব এ রোগ হলে কি কি লক্ষণ প্রকাশ পায় সে সম্পর্কে। এ রোগ হলে নিম্নের লক্ষণ গুলো সাধারণভাবে প্রকাশ পায় - 

আরও পড়ুন ঃ কড লিভার অয়েল খাওয়ার নিয়ম উপকারিতা ও সর্তকতা

  • ত্বক পুরু হয়ে যায়।
  • ত্বকে লালচে দাগ পড়ে।
  • শুষ্ক ও ফাটলযুক্ত ত্বক।
  • ত্বক প্রচন্ড চুলকায় ও ব্যথা হয়।
  • জয়েন্ট পেইন হতে পারে।
  • ছিদ্রযুক্ত বা ফাটা নখ।
  • ত্বকের আক্রান্ত জায়গাগুলো রূপালী সাদা আঁশ যুক্ত হয়। 
  • কোন কোন ক্ষেত্রে ত্বকে উজ্জ্বল লালচে বর্ণের ক্ষত দেখা যায়।

চর্মরোগ সোরিয়াসিসের কারণ

চর্মরোগ সোরিয়াসিসঃ সংজ্ঞা লক্ষণ কারণ চিকিৎসা ও প্রতিকারের ঘরোয়া উপায় সম্পর্কিত আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা জানবো চর্মের এ রোগ কি কারনে হয় সে সম্পর্কে। এ রোগের কারণগুলো নিম্নরূপ - 

চর্মরোগ সোরিয়াসিসের কারণ
  • সোরিয়াসিস রোগ হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোন কারণ এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। 
  • বংশগত কারণে এ রোগ বেশি হয়ে থাকে বলে ধারনা করা হয়।
  • বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক ব্যাধির থেকেও এরোগটি হতে পারে।
  • উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ সেবনেও হতে পারে।
  • ত্বকে আঘাত জনিত কারণে এ রোগ হতে পারে।
  • আবহাওয়া জনিত কারণে এরোগ হতে পারে।
  • কিছু কিছু ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও এ রোগ হতে পারে।
  • বেশি বেশি গলায় ইনফেকশন হলে এ রোগ হতে পারে।
  • অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের কারণে হতে পারে।
  • সূর্যের আলট্রা ভায়োলেট রশ্মি থেকেও এ রোগ হতে পারে।
  • শারীরিক ও মানসিক চাপের কারণেও রোগ হতে পারে।

চর্মরোগ সোরিয়াসিসের চিকিৎসা

চর্মরোগ সোরিয়াসিস ঃসংজ্ঞা লক্ষণ কারণ চিকিৎসা ও প্রতিকারের ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা জেনে নিব এরোগের চিকিৎসা সম্পর্কে। এ রোগের ধরন অনুসারে চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন ঃ দড়ি লাফ খেলার ৮ টি উপকারিতা ও সতর্কতা

  • বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অল্প অংশ আক্রান্ত হলে বিভিন্ন ধরনের ঔষধ যেমন - ক্রিম, জেল বা লোশন ব্যবহার করতে বলা হয়।
  • শরীরের বেশি অংশে ছড়িয়ে পড়লে মুখে খাওয়ার ঔষধ দেওয়া হয়।
  • কোন কোন ক্ষেত্রে এ রোগে আল্ট্রাভায়োলেট রে থেরাপি বা বায়োলোজিক্যাল থেরাপির মাধ্যমেও চিকিৎসা দেওয়া হয়।
  • এ রোগ কখনোই পুরোপুরি ভালো হয় না, আবার কখনোই জীবন নাসের আশঙ্কা থাকে না। নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

এ রোগ কি খুবই মারাত্মক?

চর্মরোগ সোরিয়াসিসঃ সংজ্ঞা লক্ষণ কারণ চিকিৎসা ও প্রতিকারের ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা আলোচনা করব এরোগ খুবই মারাত্মক কিনা সে সম্পর্কে।

আরও পড়ুন ঃ চালতার পুষ্টিগুণ ১৩ টি স্বাস্থ্য উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম।

  • চর্মরোগ সোরিয়াসিস কোন প্রাণঘাতী মরণব্যাধি নয়। 
  • এ রোগ তীব্র হতে পারে।
  • ত্বকে প্রচন্ড চুলকাতে পারে।
  • ত্বকে আঁশযুক্ত ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়।
  • কনুই, হাঁটু, মাথার ত্বক, বুক বা নিতম্বে হয়ে থাকে।
  • কোন কোন ক্ষেত্রে সারা শরীরেও হতে পারে।

সোরিয়াসিস কি একেবারে ভালো হয়?

চর্মরোগ সোরিয়াসিসঃ সংজ্ঞা লক্ষণ কারণ চিকিৎসা ও প্রতিকারের ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা জেনে নেব এ রোগ একেবারে ভালো হয় কিনা সে সম্পর্কে।

আরও পড়ুন ঃ কোয়েল পাখির ডিমের ১২ টি উপকারিতা খাওয়ার নিয়ম ও সর্তকতা।

সত্য কথাটা হলো এ রোগ পুরোপুরি নিরাময় যোগ্য নয় বা একেবারে ভালো হয় না। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর উপসর্গ বা লক্ষণগুলো কমিয়ে রাখা যায়। এ রোগ ভালো হয়ে যাওয়ার বা সেরে যাওয়ার পরেও আবার হতে পারে।

সোরিয়াসিস প্রতিকারের ঘরোয়া উপায়

চর্মরোগ সোরিয়াসিসঃ সংজ্ঞা লক্ষণ কারণ চিকিৎসা ও প্রতিকারের ঘরোয়া উপায় সম্পর্কিত আলোচনা এ পর্যায়ে আমরা জেনে নেব শরিয়াস কিভাবে ঘরোয়া উপায়ে প্রতিকার করা যায় সে সম্পর্কে।

সোরিয়াসিস প্রতিকারের ঘরোয়া উপায়

এরোগ এক ধরনের জটিল চর্মরোগ যা কখনোই পুরোপুরি ভালো হয় না কিন্তু ঘরোয়া ভাবে কিছু নিয়ম কানুন মেনে চললে এটি থেকে সাময়িকভাবে স্বস্তি পাওয়া যায়।

  • প্রতিদিন গোসল করে ত্বক পরিষ্কার রাখুন।
  • গোসলের সময় ত্বক বেশি ঘষাঘষি করা উচিত নয়।
  • অসুস্থ বা আক্রান্ত ত্বক ঢেকে রাখুন।
  • সূর্যালোকে বেশি থাকা উচিত নয়।
  • ত্বক শুষ্ক হলে এ রোগ বেড়ে যেতে পারে। ত্বক আদ্র রাখার জন্য ময়েশ্চারাইজার (জলপাইয়ের তেল, নারকেল তেল বা পেট্রোলিয়াম জেলি) ব্যবহার করতে পারেন।
  • অ্যালকোহল জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন। 
  • পুষ্টিকর ও টাটকা খাবার গ্রহণ করুন।
  • ধূমপান এড়িয়ে চলুন।
  • বায়ু দূষণ এলাকা এড়িয়ে চলুন, ধূলা-ময়লা গায়ে লাগলে এ রোগ বেড়ে যেতে পারে।
  • এলার্জি যুক্ত খাবার পরিহার করুন। এতে চুলকানি বেড়ে যেতে পারে। 
  • ডাক্তারের পরামর্শে বিশেষ ধরনের শ্যাম্পু বা সাবান (যেগুলো ত্বকের ক্ষতি করে না) ব্যবহার করতে পারেন।
এই রোগটি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য ও চিকিৎসা নেওয়ার জন্য আপনার চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।

সোরিয়াসিস রোগ কি সংক্রামক?

সোরিয়াসিস কোন সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগ নয়। এই রোগটি একজন থেকে আরেকজনের সংস্পর্শে সংক্রামিত হয় না।

সোরিয়াসিস রোগীদের উপকারী খাবার 

এরোগটি হলে ত্বকে অনেক চুলকায় ও নিজেকে দুর্বল লাগে। এজন্য এমন কিছু খাবার খাওয়া দরকার যে খাবারগুলো উপকার করে এবং এলার্জির উদ্বেগ না হয়। তবে এ রোগের ক্ষেত্রে খাবারের সরাসরি কোন প্রভাব নেই। এ রোগীদের উপকারী  খাবারের  তালিকা নিম্নরূপ - 

  • সামুদ্রিক মাছ,
  • মিষ্টি আলু,
  • ব্রোকলি,
  • শাক,
  • বাঁধাকপি,
  • ওটমিল,
  • ঢেঁকি ছাঁটা লাল চাল, 
  • আখরোট, 
  • রেডমিট না খাওয়াই ভালো। ইত্যাদি।

সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস কি?

সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস এক ধরনের রোগ যা সোরিয়াসিসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। এই রোগ হলে বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা হয়, জয়েন্ট ফুলে যায়। এরোগে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ রোগিদের সোরিয়াটিক আর্থাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

উপসংহার 

আশা করি, আজকের আর্টিকেলটি পড়ে আপনারা সোরিয়াসিস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে পেরেছেন ও উপকৃত হয়েছেন। তথ্যগুলি ভালো লাগলে আর্টিকেলটি শেয়ার করে দিতে ভুলবেন না প্লিজ। আর্টিকেলটি পড়ে আপনারা জানতে পেরেছেন এরোগ কোন মারাত্মক ব্যাধি নয় বা মৃত্যুর কোন ঝুঁকি নেই।

চর্মের এরোগ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। এই রোগ হলে দেখতে অন্যরকম লাগে। সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবেন। নিয়ম-কানুন মেনে চলবেন। চরমোরোগ যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। এ রোগটি দেখা দিলে অল্পতেই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। কষ্ট করে আর্টিকেল পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।



ছবি ও তথ্যগুলো সংগৃহীত

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

aksgreenit নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url