ফ্যাটি লিভার রোগ : কারণ লক্ষণ ঝুঁকি রোগ নির্ণয় চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়
ফ্যাটি লিভার রোগ : কারণ লক্ষণ ঝুঁকি রোগ নির্ণয় চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে আজকের আর্টিকেলটি লেখা। লিভার মানব শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। এটি মানব শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সম্পন্ন করে। বিভিন্ন কারণে লিভার যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা এতে চর্বি জমতে থাকে তখন তাৎক্ষণিকভাবে লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে।
আজকের আর্টিকেলটি পড়লে আপনারা জানতে পারবেন ফ্যাটি লিভার কাকে বলে? ফ্যাটি লিভারের কারণ। ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ। ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি। ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা ও এর প্রতিরোধসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে। চলুন জেনে নেওয়া যাক ফ্যাটি লিভার সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য।
পেজ সুচিপত্র
ফ্যাটি লিভার কাকে বলে
ফ্যাটি লিভার রোগ : কারণ লক্ষণ ঝুঁকি রোগ নির্ণয় চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে জানার আগে আমাদের জানা দরকার ফ্যাটি লিভার রোগ কাকে বলে সে সম্পর্কে। ফ্যাটি লিভার রোগ অর্থাৎ চর্বি বা মেদযুক্ত ও রোগাক্রান্ত যকৃত (লিভার)।
বেশ কয়েকটি রোগ যখন একসাথে লিভারে স্ট্যাটোসিসের সাথে যুক্ত থাকে তখন তাকে স্ট্যাটোটিক লিভার ডিজিজ (এস এল ডি) বলা হয়। এই রোগাক্রান্ত লিভারকেই সাধারণভাবে ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এফ এল ডি) বলা হয়।
ফ্যাটি লিভার রোগ হেপাটিক স্ট্যাটোসিস (এইচ এস) নামেও পরিচিত। লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে থাকলে অর্থাৎ লিভারের ওজনের ৫% এর বেশি চর্বি জমা হতে থাকলে লিভারে নানারকম জটিলতা সৃষ্টি হয়।
লিভারের কাজ ও ফ্যাটি লিভারের সমস্যা
ফ্যাটি লিভার রোগ : কারণ লক্ষণ ঝুঁকি রোগ নির্ণয় চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কিত আলোচনায় এখন আমরা জেনে নেব লিভারের কাজ ও ফ্যাটি লিভার হলে স্বাভাবিক কাজে কি ধরনের ব্যাঘাত ঘটে সে সম্পর্কে।
লিভার মানবদেহের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। লিভার চর্বি জমতে থাকলে স্বাভাবিক কাজকর্মের ব্যাঘাত ঘটে। বিশেষ করে -
আরও পড়ুন ঃ অঙ্কুরিত বীজ বা স্পাউটের পুষ্টিগুণ ১৬ টি স্বাস্থ্য উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম।
- রক্ত পরিশোধন করে লিভার, লিভার আক্রান্ত হলে এই কাজটি স্বাভাবিকভাবে হতে বাধাগ্রস্ত হয়।
- রক্তে বিদ্যমান টক্সিন জাতীয় পদার্থ ছাকনিরমত পরিষ্কার করে লিভার। লিভার রোগাক্রান্ত হলে এই কাজটি ব্যাহত হয়।
- শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য পরিশোধক ও পরিশোষক পদার্থ বিশেষ করে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে লিভার। ফ্যাটি লিভার হলে এ কাজটি ব্যাহত হয়।
- এছাড়াও লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলে লিভার ইনফ্যাকটেড হতে পারে। লিভারের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এমনকি লিভার ক্যান্সার বা লিভার সিরোসিস হতে পারে।
সেজন্য লিভারকে সুস্থ রাখতে লিভারের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ফ্যাটি লিভারের কারণ
ফ্যাটি লিভার রোগ : কারণ লক্ষণ ঝুঁকি রোগ নির্ণয় চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কিত আলোচনায় এখন আমরা আলোচনা করব ফ্যাটি লিভার রোগের কারণ সম্পর্কে অর্থাৎ কি কি কারণে ফ্যাটি লিভার রোগ হতে পারে সে সম্পর্কে। নিম্নোক্ত কারণে ফ্যাটি লিভার রোগ হতে পারে।
আরও পড়ুন ঃ যে ১৭ টি খাবার খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে ও শরীর সুস্থ থাকে।
- শরীরে অতিরিক্ত মেদ, চর্বি বা ওভার ওয়েট এর কারনে ফ্যাটি লিভার রোগ হতে পারে।
- অতিরিক্ত মাত্রায় মদ পান করলে লিভারে চর্বি জমে ফ্যাটি লিভার হতে পারে।
- কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড মাত্রা রক্তে যদি অতিরিক্ত পরিমাণে বেড়ে যায় তাহলে ফ্যাটি লিভার হতে পারে।
- ডায়াবেটিসের মাত্রা অতিরিক্ত হলে অর্থাৎ রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত পরিমাণে বেড়ে গেলে ফ্যাটি লিভার হতে পারে।
- বিশেষ বিশেষ সময়ে বিশেষ ধরনের কিছু ঔষধ গ্রহনের কারণে, ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ফ্যাটি লিভার হতে পারে। (গর্ভাবস্থায় বিশেষ ধরনের ঔষুধ ও হেপাটাইটিস সি এর ঔষধ, ইত্যাদি)।
- অনেকেরই বংশগত বা জেনেটিক বা জ্বীনগত কারণেও ফ্যাটি লিভার হতে পারে।
ফ্যাটি লিভার রোগের লক্ষণ
ফ্যাটি লিভার রোগ : কারণ লক্ষণ ঝুঁকি রোগ নির্ণয় চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কিত আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা জেনে নেব ফ্যাটি লিভার রোগ হলে কি কি লক্ষণ প্রকাশ পায় সে সম্পর্কে।
ফ্যাটি লিভার রোগের শুরুতেই বা প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও ধীরে ধীরে এর ব্যাপকতা বা ব্যপ্তি ছড়িয়ে পড়লে ধীরে ধীরে লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। লক্ষণগুলো নিম্নরূপ -
- শরীরের ওজন কমে যাওয়া,
- শরীরে ক্লান্তি অনুভব করা,
- অবসাদ মনে হওয়া,
- অস্বস্তি বোধ হওয়া,
- অলসতা অনুভব করা,
- পেটে ব্যথা অনুভব করা,
- প্রস্রাব, ত্বক ও চোখ হলুদ রং ধারণ করা,
- পা ফুলে যাওয়া,
- পেট ঘাটা ও বমি বমি ভাব হওয়া। ইত্যাদি।
ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুঁকি
ফ্যাটি লিভার রোগ : কারণ লক্ষণ ঝুঁকি রোগ নির্ণয় চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কিত আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা জেনে নিব ফ্যাটি লিভার রোগ হলে কি ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয় সে সম্পর্কে।
আরও পড়ুন ঃ ট্যাবলেটের মাঝখানে স্কোরিং বা দাগ থাকে কেন?
ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুঁকি গুলো নিম্নরূপ -
- রক্ত ঠিকমতো পরিশোধন নাও হতে পারে,
- রক্তে বিদ্যমান ক্ষতিকর টক্সিন পদার্থ ফিল্টার নাও হতে পারে,
- অতিরিক্ত চর্বি জমার কারণে লিভার ক্যান্সার হতে পারে,
- চর্বি জমতে থাকলে ধীরে ধীরে এক সময় লিভার সিরোসিস হতে পারে।
- অতিরিক্ত চর্বি জমার কারণে লিভারে ক্যান্সার হতে পারে। ইত্যাদি।
- উল্লেখিত ঝুঁকিগুলো ছাড়াও অন্যান্য ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে।
ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুঁকিতে যারা
ফ্যাটি লিভার রোগ : কারণ লক্ষণ ঝুঁকি রোগ নির্ণয় চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কিত আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা জেনে নেব ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুঁকিতে যারা অর্থাৎ ফ্যাটি লিভার রোগে যারা বেশি আক্রান্ত হতে পারেন সে সম্পর্কে।
আরও পড়ুন ঃ কখন দাঁত ব্রাশ করা উপকারী সকালে খাওয়ার আগে না রাতে খাওয়ার পরে।
নিম্নলিখিত লক্ষণধারী ব্যক্তিরা ফ্যাটি লিভার রোগের জন্য বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
- যাদের মেদ-চর্বি ও ওজন অতিরিক্ত বেশি,
- যাদের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস অর্থাৎ রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি,
- যে সকল ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত পরিমাণে মদ পান করেন,
- যাদের রক্তে কোলেস্টেরল বা ট্রাইগ্লিসারাইড এর মাত্রা অতিরিক্ত বেশি।
- যাদের পেটের আকার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায় তারা,
- অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে ফ্যাটি লিভার হতে পারে,
- মেনোপজ স্টেজের নারীদের ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বেশি থাকে,
- যারা বিশেষ ধরনের কিছু ঔষধ সেবন করেন তারা।
ফ্যাটি লিভার রোগ নির্ণয়ের উপায়
আরও পড়ুন ঃ গর্ভাবস্থায় গর্ভবতী মা ও গর্ভে শিশুর ক্ষতি করে এমন ১০ পানীয় এড়িয়ে চলুন।
- প্রাথমিক পর্যায়ে ফ্যাটি লিভারের রোগ নির্ণয়ের জন্য রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা দিয়ে থাকেন,
- এ রোগ নির্ণয়ের জন্য লিভারের আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান, সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন,
- লিভার থেকে লিভারের টিস্যু নিয়ে বায়োপসি করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন,
- লিভারের ইলাস্ট্রোগ্রাফি ফাইব্রোস্ক্যান করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
ফ্যাটি লিভার রোগ প্রতিরোধের উপায়
ফ্যাটি লিভার রোগ : কারণ লক্ষণ ঝুঁকি রোগ নির্ণয় চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কিত আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা জেনে নিব ফ্যাটি লিভার রোগ প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে। ফ্যাটি লিভার রোগ প্রতিরোধের জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো ভালোভাবে মেনে চলা উচিত।
- সর্বদা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত,
- চর্বি জাতীয় খাবার পরিহার করা বা কম খাওয়া উচিত,
- অ্যালকোহল পান করা থেকে বিরত থাকা উচিত,
- ডায়াবেটিস সর্বদা নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত,
- রক্তের কোলেস্টেরল বা ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখা উচিত,
- ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধ করার জন্য স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করা জরুরী,
- অতিরিক্ত তেল, চর্বি ও মসলা জাতীয় খাবার কম খেতে হবে,
- দুধ চা বা কনডেন্স মিল্ক এর চা পরিহার করতে হবে,
- ফ্যাটি লিভার রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত প্রতিদিন কমপক্ষে আধাঘন্টা ব্যায়াম করা উচিত। ইত্যাদি।
ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা
লিভার মানব দেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ অপর দিকে এর রোগও বেশ জটিল। সেজন্য সকলের উচিত ফ্যাটি লিভার হওয়ার আগেই স্বাস্থ্যকর জীবনধারা মেনে চলা।
সত্য কথা হলো এটাই যে ফ্যাটি লিভারের সুনির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই। তবে ফ্যাটি লিভার হলে চিকিৎসকরা চিকিৎসার পাশাপাশি কিছু পরামর্শ দিয়ে থাকেন সেই মোতাবেক চললে ফ্যাটি লিভার রোগের উপশম হতে পারে। যেমন -
- সব সময় স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা,
- স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা,
- ওজন নিয়ন্ত্রণ করা,
- ওষুধের ব্যবহার সীমিত করা,
- কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা,
- রক্তের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা,
- অ্যালকোহল সেবন না করা,
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা। ইত্যাদি।
ফ্যাটি লিভার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি গুরুতর লিভার সিরোসিস বা জটিল সমস্যায় ভুগেন সেক্ষেত্রে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট এর জন্য চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়ে হয়ে থাকেন, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
উপসংহার
প্রিয় পাঠক বৃন্দ, ফ্যাটি লিভার সম্পর্কিত আজকের আর্টিকেলটি পড়ে ফ্যাটি লিভারের যাবতীয় তথ্য সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানতে পেরেছেন ও উপকৃত হয়েছেন বলে আমি করি। রোগ কোনটাই সহজ নয়, সব রোগই কঠিন! যেহেতু লিভার রোগের তেমন কোন চিকিৎসা নেই। সেজন্য সব সময় স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে লিভার সুরক্ষিত রাখা উচিত।
আশা করি, আজকের আর্টিকেলটি পড়ে আপনাদের ভালো লেগেছে। আপনাদের ভাললাগাটা অন্যের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না প্লিজ। এ সম্পর্কিত কোনো জিজ্ঞাসা থাকলে কমেন্টস বক্সে জানানোর অনুরোধ রইল। এ ধরনের আরও আপডেট তথ্য পাওয়ার জন্য চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে আমাদের সাথেই থাকুন। কষ্ট করে আর্টিকেল করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
aksgreenit নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url