নাউরু রাজধানী বিহীন দেশ হিরো থেকে জিরো হওয়া এক রাষ্ট্র
নাউরু রাজধানী বিহীন দেশ হিরো থেকে জিরো হওয়া এক রাষ্ট্র এ সম্পর্কে আজকের আর্টিকেলটি লেখা। দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ পাচার যে কত বড় অভিশাপ তা হিরো থেকে জিরো হওয়া রাষ্ট্র নাউরুর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। এটি বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র হলেও অর্থনৈতিকভাবে ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে। যার সামনে ছিল এক মাত্র ধনি রাষ্ট্র কুয়েত। নাউরুকে এক সময় প্রশান্ত মহাসাগরের কুয়েত বলা হলেও বর্তমানে হতদরিদ্র দেশ হিসেবে অন্যের কাছে হাত পেতে চলে।
প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে ভেসে থাকা এক দেশ নাউরু। এই নাউরু অঞ্চল হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন সামুদ্রিক পাখির অভয়ারণ্য ছিল। এই সময়ে পাখির ফেলে দেওয়া বর্জ্য বা পায়খানা বা বিষ্ঠা জমতে জমতে বিশাল আকৃতির ফসফেট টিলায় পরিণত হয়। যা কৃষিকাজে জমির উর্বরতা বাড়ানোর জন্য প্রধান উপকরণ! পরবর্তীতে এই ফসফেটের কারণেই ভাগ্য খুলতে শুরু করে নাউরুর। তাহলে কিভাবে হল এই বেহাল দশা! চলুন নেয়া যাক সব তথ্যগুলো।
পেজ সুচিপত্র
দেশ হিসাবে নাউরুর পরিচিতি
নাউরু রাজধানী বিহীন দেশ হিরো থেকে জিরো হওয়া এক রাষ্ট্র এ সম্পর্কিত আলোচনার প্রথমেই আমরা জেনে নেব দেশ হিসাবে নাউরুর পরিচিতি সম্পর্কে। নাউরু হলো দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের মাইক্রোনেশিয়া অঞ্চলে অবস্থিত একটি অতিক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র।
নাউরু দেশটির পূর্বে কিরিবাতির বানাবা দ্বীপ, উত্তর-পশ্চিমে টাভালু, উত্তর-পূর্বে সলোমান দ্বীপপুঞ্জ এবং উত্তর-পূর্বে রয়েছে পাপুয়া নিউগিনি।
এক নজরে নাউরু
- দেশটির নাম ঃ নাউরু (Nauru).
- দেশটির সাংবিধানিক নাম ঃনাউরু প্রজাতন্ত্র (Repablic of Nauru).
- মুদ্রার নাম ঃ অস্ট্রেলিয়ান ডলার।
- নাউরুর লোক সংখ্যা ঃ প্রায় ১৩,০০০, (১৩ হাজার)। (২০০৫ সালের হিসাব অনুযায়ী)।
- আদিবাসীর নাম ঃ নাউরুয়ান।
- নাউরুর আয়তন ঃ মাত্র ২১ বর্গ কিলোমিটার (৮ বর্গ মাইল)।
- ওশেনিয়া মহাদেশের একটি দেশ নাউরু।
- নাউরু বিশ্বের ক্ষুদ্রতম দ্বীপ রাষ্ট্র। বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। (ভার্টিকাল সিটি ও মোনাকোর পরেই ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে নাউরুর অবস্থান)।
- দেশটি বিশ্বের ক্ষুদ্রতম স্বাধীন প্রজাতন্ত্র অর্থাৎ স্বাধীন রাষ্ট্র।
নাউরুর রাজধানী
নাউরু রাজধানী বিহীন দেশ হিরো থেকে জিরো হওয়া এক রাষ্ট্র এ আলোচনার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হলো নাউরু দেশটির রাজধানী সম্পর্কিত আলোচনা। রাজধানী হল একটি রাজ্যের বা দেশের বা অঞ্চলের কেন্দ্রীয় শহর, যেখান থেকে দেশটির সকল সরকারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
আরও পড়ুন ঃ আমেরিকায় কোন কাজের চাহিদা বেশি এবং কোন কাজের বেতন বেশি।
সাধারণত সরকারের সকল ধরনের কার্যক্রম, সভা ও অধিবেশন ইত্যাদি সবকিছু রাজধানী শহরেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সাধারণভাবে এটিই সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার বা আইন সিদ্ধ বিষয়। প্রয়োজনবোধে বা ক্ষেত্রবিশেষে একটি দেশ বা রাজ্যের আইনসভা বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত থাকতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে একটি রাষ্ট্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল কার্যক্রম রাজধানী থেকেই পরিচালিত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিটি দেশের রাজধানী রয়েছে যা সংশ্লিষ্ট দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। একটি দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রম রাজধানী কেন্দ্রিক হয়ে থাকে।
রাজধানী একটি দেশের এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পরেও পৃথিবীতে এমন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ আছে যার কোন রাজধানী নেই। দেশটির নাম নাউরু। দেশটির সরকারি অফিসগুলো ইয়ারেন জেলায় অবস্থিত। সেখান থেকেই রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
নাউরু দেশটি বিশ্বের ক্ষুদ্রতম স্বাধীন প্রজাতন্ত্র ও একমাত্র দেশ যার কোন রাজধানী নেই। এটি বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম ও স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশ কিন্তু দেশটির কোনো রাজধানী নেই।
নাউরুর স্বাধীনতা লাভ
নাউরু রাজধানী বিহীন দেশ হিরো থেকে জিরো হওয়া এক রাষ্ট্র এই আলোচনাটির এ পর্যায়ে আমরা আপনাদেরকে এখন জানাবো এই ছোট্ট দেশটির স্বাধীনতা লাভ সম্পর্কে। বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দ্বীপ রাষ্ট্র নাউরু।
আরও পড়ুন ঃ ইতালিতে কোন কাজের চাহিদা বেশি ও কোন শ্রমিকের বেতন কত (আপডেট ২০২৪)
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে জার্মানি এ দেশটি দখল করে নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এটি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের অধিনে একটি ম্যান্ডেট বা প্রশাসিত এলাকায় পরিণত হয়, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান এটি দখল করে। যুদ্ধের শেষে এটি আবার অধীনস্থ প্রশাসিত এলাকায় পরিণত হয়।
এই দেশটি বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয় অর্থাৎ পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৬৮ সালে। ১৯৭৫ সালে মাত্র সাত হাজার জনগণের ক্ষুদ্র দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল তুঙ্গে। তখনই খেতাব পায় বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী রাষ্ট্র হিসেবে। যার সামনে ছিল বিশ্বের এক নম্বর ধনী দেশ কুয়েত।
দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি
নাউরু রাজধানী বিহীন দেশ হিরো থেকে জিরো হওয়া এক রাষ্ট্র এই শিরোনামটি আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা আপনাদেরকে জানাবো দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে। নাউরু, আয়তনে ক্ষুদ্র দেশ হলেও ফসফেট খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ ছিল এই দেশ।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এই ফসফেট সম্পদের দিকে নজর পড়ে জার্মান, জাপান, বৃটেন, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার। স্বাধীনতা লাভের পরে অর্থাৎ ১৯৬৮ সালের পরে থেকে এই ফসফেট পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর কাছে বিক্রি করতে শুরু করে নাউরু।
চাঙ্গা হতে থাকে ক্ষুদ্র দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ১৯৭৫ সালে দেশটির সরকারি ব্যাংকে জমা পড়ে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই সুবাদে দেশটি দ্বিতীয় ধনী রাষ্ট্রের খেতাব অর্জন করে।
নাউরু বিমানবন্দর
নাউরু দেশটি যখন অর্থনৈতিকভাবে চাঙ্গা ছিল তখন তারা মনে করেছিল নিজের দেশে ফসল না ফলিয়ে অন্য দেশ থেকে খাদ্য আমদানি করবে। সেজন্য তারা নিজেদের কৃষিকাজে মনোযোগ না দিয়ে একটি অত্যাধুনিক বিমানবন্দর তৈরি করে,
আরও পড়ুন ঃ সিঙ্গাপুর কোন কাজের বেতন কত এবং কোন কাজের চাহিদা বেশি (আপডেট ২০২৪)
যার নাম 'নাউরু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর'। বিপুল অর্থ ব্যয় করে দেশটি একসঙ্গে কিনে ফেলে ৭টি বিলাস বহুল বিমান, যাতে করে দেশটির দশ শতাংশ জনগণকে এক সঙ্গে বহন করতে সক্ষম। প্রতিটা সেক্টরের দেশ পরিচালনার অদূরদর্শিতার ছাপ
বিলাস বহুল গাড়ি
বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি! এই গাড়ি যেন তাদের অর্থনৈতিক সচল অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে অচল অবস্থা আনতে শুরু করে। মাত্র ২১ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ভূখণ্ড যেখানে সাইকেল নিয়ে প্রদক্ষিন করতে বা ঘুরতে সময় লাগে মাত্র দেড় থেকে দুই ঘন্টা।
আরও পড়ুন ঃ দুবাই কোন কাজের বেতন কত এবং কোন কাজের চাহিদা বেশি (আপডেট ২০২৪)
তৎকালীন সময় দেশটির যেন টাকা রাখার জায়গা নেই, এমন অবস্থ!। তারা আমদানি করে চওড়া দামে শত শত বিলাসবহুল গাড়ি। পরবর্তীতে এই গাড়িগুলোও তাদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতির আরেকটি কারণ এই গাড়ি বিলসিতা।
বিলাসী জীবন ও অর্থ পাচার
নাউরু বাসীর এই বিলাসী যেন শেষ হবার নয়! সব কিছু একসঙ্গে দেখভাল করার জন্য তারা একটি ট্রাস্ট গঠন করে, যার নাম হলো "নাউরু টাস্ট"। ট্রাস্ট গঠন করার পরেও দেশটির শেষ রক্ষা হয়নি।
অবাস্তব পরিকল্পনা, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি আর অর্থ পাচার এই সবকিছু করে সরকারি লোকজন রাষ্ট্রের টাকায় বিদেশের বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে শুরু করে। যার কারণে দেশটি তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।
আরও পড়ুন ঃ ওমানে কোন কাজের চাহিদা বেশি ও কোন কাজের বেতন কত
দেশটির উচ্চ পর্যায়ের লোকজন, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, লন্ডন ও ফিজির মত দেশগুলোতে তৈরি করে নিজেদের নামে বিলাসবহুল হোটেল। এর ফলে তারা প্রচুর পরিমাণ অর্থ পাচার করতে শুরু করে।
এই অদূরদর্শিতা ও অনৈতিকভাবে অর্থ পাচার করার কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যে দেশটি অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে দেশটি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে অন্য দেশের কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়।
অর্থনীতিতে ধস নামার শুরু
নাউরু রাজধানী বিহীন দেশ হিরো থেকে জিরো হওয়া এক রাষ্ট্র এ সম্পর্কিত আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা আলোচনা করব না নাউরুর অর্থনীতিতে ধবস নামার কারণ কি সে সম্পর্কে।
১৯০৭ সাল থেকে এখানকার অর্থনীতির প্রধান আয় আসে ফসফেট আকরিক আরোহণের মাধ্যমে। তবে বর্তমানে প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এই খনিজ ফসফেট। আর এই খনিজ আরোহণ করতে গিয়ে নারুর পরিবেশগত বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছে।
বলা যায় দ্বীপের এই সম্পদ রক্ষার্থে স্থাপিত তহবিলের অব্যবস্থাপনার ফলে এখানকার অর্থনীতিতে ধবস নামে। অর্থ উপার্জনের জন্য দেশটির সরকার বিভিন্ন অপ্রচলিত ও অস্বচ্ছ পদ্ধতির আশ্রয় নেয়
কথাটি অপ্রিয় হলেও সত্য ১৯৯০ এর দশকের শুরুর দিকে নাউরু কালো টাকা সাদা করার আখড়ায় পরিণত হয়। আর তখনই শুরু হয় দেশটির আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামগত সকল ধ্বংসের।
দুই যুগেরও কম সময়ের ব্যবধানে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ও দ্বিতীয় ধনী রাষ্ট্র থেকে ভাড়াটে বা হাত-পাতা বা খয়রাতি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে নাউরু।
নাউরুর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
নাউরু রাজধানী বিহীন দেশ হিরো থেকে জিরো হওয়া এক রাষ্ট্র এই শিরোনামটি আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা আপনাদেরকে জানাবো দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা কিভাবে ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে পাশের দেশ অস্ট্রেলিয়া সে সম্পর্কে।
এই দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা ও অন্যান্য নিয়ম-শৃঙ্খলা যখন আরো অবনতি হতে শুরু করে, তখন ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়া নাউরুকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।
নাউরুকে সরাসরি সাহায্য না করে সেখানে একটি অস্ট্রেলিয় শরনার্থী ও উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করে। বিনিময়ে তাদেরকে ভাড়া হিসেবে অর্থ দেওয়া শুরু করে। তখন থেকেই দেশটি অস্ট্রেলিয় সরকারের অনুদান গ্রহণ করছে।
নাঊরুর আইন-শৃঙ্খলা থেকে শুরু করে সকল সার্বিক ব্যবস্থা এতই অবনতি হতে শুরু করে যে, খাবার পানি সংগ্রহের জন্যও জনগনকে মারামারি করতে হতো।
জীবনের নিরাপত্তাতো অনেক দূরের ব্যাপার। ঠিক সেই সময় ২০০৮ সালে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও আন্দোলনের কারণে অস্ট্রেলিয়া শরণার্থী পুনর্বাসন কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়।
আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নতি করে ২০১৪ সালে আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে নাউরু। অস্ট্রেলিয়া আবার পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করে, বিনিময়ে বিপুল অর্থ প্রদান করে, কিন্তু এ অবস্থা বেশি দিন ধরে রাখতে পারেনি দেশটি।
ফলে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কেন্দ্রটি পূনরায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। যার কারণে দেশটি অর্থনৈতিক দুরবস্থার চরম সীমায় পৌঁছে যায়। নাউরুর অর্থনৈতিক অবস্থার এমন বেহাল দশা হয় যে, দেশটি হিরো থেকে জিরো হতে শুরু হতে করে।
সংগীত অনুষ্ঠান করে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা
বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী রাষ্ট্র মাত্র দুই যুগ সময়ে কিভাবে হিরো থেকে জিরো হতে হলো? এর সবকিছু যেন এখানেই শেষ নয়? অন্য রাষ্ট্র থেকে ঋণ করে অর্থ ফেরত দিতে হবে। সেজন্য অর্থ উপার্জনের জন্য উপায় খুঁজতে শুরু করে তারা। শুরু হলো ধ্বংসের নতুন খেলা।
একজন অর্থ বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিলেন লন্ডন ভিত্তিক ব্যান্ড "ইউনিট ফোর প্লাস টু"কে দিয়ে সংগীত অনুষ্ঠান আয়োজন করতে। লন্ডনে তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে উঠে আসবে অর্থ।
কতটুকু অদূরদর্শী ও কান্ডজ্ঞানহীন হলে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেওয়া হয় অন্য একটি দেশের সংগিত দলের অনুষ্ঠানের উপর। সেটি নাউরু সরকারকে না দেখলে বোঝা যাবে না।
মাত্র দু'সপ্তাহ চলার পর সেই সংগীত অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে নাউরুর উপর পড়ে ৭০ লাখ ডলার ঋণের বোঝা। এই ঋনের বোঝা নাউরুর সরকারের পক্ষে কোনোভাবেই পরিশোধ করা সম্ভব ছিল না।
এজন্য অনুষ্ঠান পরিচালনায় যে সকল প্রতিষ্ঠার অর্থ খরচ করেছিল তারা নাউরুর সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেয়।সঙ্গে সঙ্গে বাজেয়াপ্ত হয়ে যায় পুরো জাতির ভবিষ্যৎ। পথে বসতে বাধ্য হয় পুরো নাউরু বাসি।
আবাদি জমি ও ভিটা-মাটি শূন্য নাউরু
আবাদি জমি ও ভিটা-মাটি শূন্য হয়ে পড়ে নাউরু ঋণের বোঝা শোধ করতে গিয়ে। সরকার তথা পুরো জাতির নিজস্ব বলতে এখন আছে শুধু ২১ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই নাউরু ভূখন্ডটুকু। যার কোথাও কোন ফসল বা আবাদ করা সম্ভব না।
ফসফেট আরোহনের উদ্দেশ্যে মাত্রাতিরিক্ত খোড়াখুড়ির কারণে আশেপাশের সব পানি দূষিত হয়ে পড়েছিল আর সেই সঙ্গে সাত হাজার লোক যারা সবাই মিলে এই ভূখণ্ডে আটকা পড়ে গিয়েছে।
বর্তমানে এদের সবার মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সরকারের প্রতি এখন প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। নাউরু হয়ে গেল ভিলেন, রাজা থেকে প্রজা বনে যাওয়া একটি দেশ।
ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা
ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে নাউরু সরকার। সরকার কর্তৃক ঘোষনা করা হয় চাইলে যে কেউ ২০ হাজার ডলার জমা দিয়ে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন এ দেশে। কিন্তু এতেও হিতে বিপরীত হলো!
অতি সাধারণ ব্যবস্থাপনাকে কাজে লাগিয়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মাফিয়া গোষ্ঠী ৭০ বিলিয়ন ডলারের অর্থ পাচার করে বসে। শুরু হলো আরো করুণ দশা। করুন পরিনিতি এখানেই থেমে থাকে নি।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে কসোভো ও আবখাজিয়াকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য নাউরু রাশিয়ার কাছ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থ আত্মসাৎ করেছে।
যদিও জাতিসংঘে নাউরু এ ঘটনা অস্বীকার করে এবং মানবিক দিক বিবেচনায় পুতিন সরকার নাউরুকে ৫০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে বলে জানায়। অর্থনৈতিক অবস্থার চরম অবক্ষয়ে পৌঁছে যায় দেশটি।
বর্তমানে দেশটির বেহাল দশা
নাউরু রাজধানী বিহীন দেশ হিরো থেকে জিরো হওয়া এক রাষ্ট্র এই শিরোনামটি আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা আপনাদেরকে জানাবো বর্তমানে দেশটির বেহাল দশা অর্থাৎ এক সময়কার দ্বিতীয় ধনী রাষ্ট্র বর্তমানে এই দুর্দশা সম্পর্কে।
মাথাপিছু আয়ের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা অর্থ সমৃদ্ধ দেশ নাউরুর জনগনের অপচয়, বিবেচনাহীন ফসফেট আরোহন, অতিবিলাসতা, অর্থপাচার, অদূরদর্শিতা ও দুর্নীতির কারণে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থার ধস নামে। বলা যায় দেশটি নিজের পায়ে নিজেই কুঁড়াল মেরেছে।
নাউরু কর্তৃপক্ষ এমন ভাবে টাকা উড়াচ্ছিল বা বিলাসিতা করছিল যে তারা মনে করেছিল এই টাকা কোন দিনই শেষ হবে না। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস!
এক সময়কার, বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী রাষ্ট্র নাউরুর বর্তমানে না আছে কোন আবাদি জমি, না আছে মানুষের নিশ্চিন্ত জীবন। কি করুণ দশা! বিশ্ববাসীর কাছে রাজা থেকে প্রজায় পরিনত হয় দেশটি।
দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
নাউরু রাজধানী বিহীন দেশ হিরো থেকে জিরো হওয়া এক রাষ্ট্র এ সম্পর্কিত আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা আপনাদেরকে জানিয়ে দেব দেশটির বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে।
বর্তমানে নাইরুর অর্থনীতি, নিরাপত্তা, উচ্চশিক্ষা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সবই পরিচালিত হয় অস্ট্রেলিয়ার পরামর্শে। দেশটির শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও পড়াশোনার জন্য অস্ট্রেলিয়া সরকার বৃত্তি প্রদান করে থাকে।
নিঃস্ব নাউরু জাতির করুন পরিনতি ও স্বাস্থ্যের অবস্থা
নিঃস্ব নাউরু জাতির করুন পরিনতি ও স্বাস্থ্যের অবস্থা! বর্তমান নাউরুর দিকে চোখ রাখলে দেখতে পাবেন সেখানকার ৭০% জমি আছে যাতে কোন প্রকার চাষাবাদ সম্ভব হয় না। সেখানকার ৯০ শতাংশ নাগরিকই বর্তমানে বেকার। ফলে দিনে দিনে তাদের ভাগ্যের আরও অবনতি ঘটছে।
এখানকার জনগণ বর্তমানে নিম্নমানের খাবার খাচ্ছে আর বিভিন্ন রকম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্থূলতায় ভুগছেন নাউরুর ৯৭ শতাংশ পুরুষ ও ৯৩ শতাংশ নারী। কিডনি বিকল ও হৃদরোগ সেখানে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ নাগরিকের রয়েছে টাইপ টু ডায়াবেটিস।
উপসংহার
প্রিয় পাঠক বৃন্দ, আজকের আর্টিকেলটি পড়ে আপনারা জানতে পেরেছেন বিশাল প্রতিপত্তির মানিক ও এক সময়কার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী রাষ্ট্র নাউরুর উত্থান ও পতন সম্পর্কে। অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, অর্থ পাচার, দূরদর্শিতার অভাব ও দুর্নীতির ফলাফল যে এত মারাত্মক হতে পারে বা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্রকে দিনে দিনে ভিখারি রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে তা নাউরুকে না দেখলে বুঝতেই পারতেন না। শুধু দুর্নীতি করার কারণে মাত্র দুই যুগেই বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী রাষ্ট্র থেকে ভাড়াটে বা 'হাত পাতা' রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে নাউরু। আসুন আমরা সবাই দুর্নীতিকে না বলি। দেশকে ভালোবাসি।
বর্তমান নাউরুর করুণ পরিণতি অর্থাৎ বিশ্বের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ধনী রাষ্ট্রের হিরো থেকে জিরো হওয়ার কাহিনী সকল সচেতন বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বদা দূরদর্শিতা ও সচেতনতা থাকা উচিৎ। বিখ্যাত লেখক 'সোমার সেট মম' এর সেই উক্তিটি দিয়েই আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই, তিনি তাঁর 'মাদার এন্ড ম্যানভেল' গল্পের মধ্যে বলেছিলেন 'জেরি হ্যাজ নো মাদার, হ্যাজ নো কেটস' ঠিক তেমনি বলা যায় শুধু দূর্নীতি করার কারণে আজ 'নাউরু হ্যাজ নো প্রপার্টি, হ্যাজ নো মানি'।
aksgreenit নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url